বুধবার, ৫ জুন, ২০১৩

চলতি বাজেটের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি আকার নিয়ে কাল আসছে বাজেট


:: আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের ::

জাতীয় সংসদে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের মহাজোট সরকারের শেষ বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আগামীকাল ৬ জুন বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় তিনি এই বাজেট উপস্থাপন করবেন। এ বাজেটের পরিমান হবে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হবে চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি। বর্তমান বাজেটের আকার এক লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। উপস্থাপিত বাজেটের উপর চল্লিশ ঘণ্টা আলোচনার পর আগামী ৩০ জুন ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরের এই বাজেট পাশ করা হবে।

বৃহস্পতিবার বাজেট বক্তৃতা, বাজেটের সংক্ষিপ্তসার, বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি, ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা: হালচিত্র-২০১৩, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাত উন্নয়নে পথনক্শা: অগ্রগতির ধারা, সম্পূরক আর্থিক বিবৃতি, নারীর উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৪০টি মন্ত্রণালয়/বিভাগের কার্যক্রম, সংযুক্ত তহবিল-প্রাপ্তি, অর্থনৈতিক সমীক্ষা, মঞ্জুরী ও বরাদ্দের দাবিগুলো (অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন), মঞ্জুরি ও বরাদ্দের দাবিগুলো (উন্নয়ন), রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা: বর্তমান ও ভবিষ্যত, বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও অসমতা: উত্তরণের পথেযাত্রা, জেলা বাজেট, মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি এবং মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো ওয়েবসাইটে প্রকাশসহ জাতীয় সংসদ থেকে সরবরাহ করা হবে।

একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ২০১৩-১৪’ এর একটি দলিল এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রণীত ‘ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যাবলী ২০১২-১৩’ জাতীয় সংসদে পেশ করা হবে।

এছাড়া রাজনীতির ডামাডোলে দলীয় ইচ্ছার সঙ্গে গলা মিলিয়ে কালো টাকা সাদা, বিদ্যুতে অব্যাহত ভর্তুকি, সংসদ সদস্যদের জন্য থোক বরাদ্দ, তোড়জোড় করে এমপিওভুক্তি, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়ানো, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বরাদ্দ, কর অবকাশ সুবিধা বাড়ানোর মতো নানা স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী; যা তিনি বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করবেন।

নির্বাচনী বছরে জনতুষ্টি আর চমক হিসেবে সামর্থের চেয়ে অনেক বড় বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। আর তা করতে গিয়ে টাকার যোগানের জন্য বিদেশ নির্ভরতা বাড়াতে চলেছেন তিনি। নানা সমস্যায় বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, অর্থ ফিরিয়ে নেওয়ার মত ঘটনা ঘটছে। কিন্তু তারপরও মন্ত্রী চলতি বছরের চেয়ে বেশি বৈদেশিক সাহায্য বিবেচনায় নিয়ে বাজেটে আয়-ব্যয়ের অংক মিলিয়েছেন।

আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেটে অনুন্নয়নমূলক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৩৪ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনুন্নয়ন রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। যার একটি বড় অংশ যাবে ঋণের সুদ পরিশোধে। যার পরিমাণ ২৭ হাজার ৭৪৩ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে মোট উন্নয়নমূলক ব্যয় ধরা হয়েছে ৭২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব বাজেট হতে অর্থায়ন করা উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বহির্ভূত প্রকল্পে ৩ হাজার ১৪ কোটি টাকা, এডিপিতে ৬৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা এবং এডিপি বহির্ভূত কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে মোট উন্নয়নমূলক ব্যয় ধরা হয়েছিলো ৬০ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা।

মোট বাজেটের ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ ব্যয় হবে সুদ পরিশোধে। আগামি বছর শুধু অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদই ব্যয় হবে ২৬ হাজার ৩ কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণের সুদে ১ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এছাড়া অনুন্নয়ন মূলধন ব্যয় ২০ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা, খাদ্য হিসাবে ২৬৩ কোটি টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিমখাতে ব্যয় হবে ১৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা।


অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব পাওয়ার লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর রাজস্ব এক লাখ ৪১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। কর রাজস্বের মধ্যে আবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত কর ব্যবস্থা থেকে আসবে এক লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা, বাকী  ৫ হাজার ১২৯ কোটি টাকা এনবিআর বহির্ভূত কর ব্যবস্থা থেকে আসবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।অন্যদিকে কর ব্যাতিত প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ২৬ হাজার ২৪০ কোটি টাকা।

বিদেশী অনুদান যেহেতু ফেরত দিতে হয় না,তাই এ ধরণের অনুদানকে রাজস্ব প্রাপ্তির মধ্যে হিসাব করা হয়। আগামি অর্থবছর ৬ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার বিদেশি অনুদান পাওয়া যাবে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয় । বিদেশী এই অনুদানসহ নতুন অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির পরিকল্পনা করা হয়েছে ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ৫৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে লক্ষমাত্রা অনুযায়ী বৈদেশিক অনুদান পাওয়া গেলে নতুন অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৪৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৪ শতাংশ।

বাজেটে ঘাটতি অর্থ জোগাড় করতে দেশের ভেতর থেকে সরকার ঋণ নেবে ৩৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ২৫ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক ঋণ নেবে ১৪ হাজার ৩৫৫ কোটি ও স্বল্পমেয়াদী থাকবে ১১ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা। ব্যাংক বহির্ভূত  ঋণ থাকছে মোট ৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ৪ হাজার ৯৭১ কোটি ও অন্যান্য উৎস থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষমাত্রা ঠিক করেছে অর্থমন্ত্রণালয়।

বর্তমান অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা আছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ অবশ্য এখন পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার নিচেই আছে। তবে আগের বছর ১৮ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেও শেষ পর্যন্ত সরকার ২৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। নির্বাচনের বছরে একই পরিণতি হতে পারে বলে অনেকের আশংকা।

আসন্ন বাজেট সম্পর্কে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারের শেষ বাজেট দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।

নতুন অর্থবছরে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বহাল রাখা হচ্ছে। অবৈধভাবে উপার্জিত টাকা দিয়ে জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট কেনা যাবে। জমি বা প্লট কেনার ক্ষেত্রে হস্তান্তর বা চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ টাকা দিলেই আর কোনো কর দিতে হবে না। একইভাবে শেয়ারবাজারে ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এর মাধ্যমে অবৈধ আয়ের মালিকদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। কর ফাঁকি দিতে এ সুযোগ করদাতাদের উত্সাহিত করবে। অন্যদিকে নিরুত্সাহিত হবেন প্রকৃত করদাতারা। অবৈধ সম্পত্তির মালিকদের সন্তুষ্ট করার প্রস্তাব রাজস্ব আহরণে স্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করবে।

অপরদিকে এ বাজেট নিয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মনসুর বলেন, সরকার শেষ বাজেটে এসে স্বল্পমেয়াদি যেসব ঘোষণা দিতে যাচ্ছে তা জনগণসম্পৃক্ত। ভোটের বিবেচনায় এসব ঘোষণা দেয়া হবে। মজুরি, বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত তা প্রয়োজন ছিল। তবে বড় ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়াই শ্রেয়।

ড. আহসান মনসুর মনে করেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের মতো চলমান বড় প্রকল্পের কাজ শেষ করার বিষয়ে বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন। তবে সরকারের মেয়াদ শেষে এসে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শুরু না করাই উত্তম।

ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি ওয়েবসাইট লিংক –  www.nbr-bd.org, www.plancomm.gov.bd, www.imed.gov.bd, www.bdpressinform.org, www.pmo.gov.bd


কোন মন্তব্য নেই:

অনুবাদ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ